Leave a comment

মুসলিম আইনে দেনমোহর:-

বিবাহ একটি সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম শর্ত দেন-মোহর। এই শর্তটি পূরণ ব্যতীত কোন বিবাহ বৈধ হতে পারে না।

দেনমোহরের সংজ্ঞা দিতে ডি.এফ মোল্লা বলেন, মোহর বা মোহরানা হলো কিছু টাকা বা অন্য কিছু সম্পত্তি যা বিবাহের প্রতিদান স্বরুপ স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পাবার অধিকারী।

দেনমোহর (মোহর) হইল কিছু টাকা অথবা অন্য কোন সম্পত্তি যাহা স্ত্রী স্বামীর নিকট হইতে বিবাহের মূল্যস্বরূপ পাইবার অধিকারী হয়, [বেইলী ৯১] এখানে মূল্য শবদটি ঠিক চুক্তি আইনে ব্যবহৃত শব্দের অর্থে ব্যবহৃত হয় না।মুসলিম আইনে দেনমোহর স্ত্রী প্রতি সম্মান প্রদর্শন হিসাবে স্বামীর উপর আরোপিত একটি দায়িত্ব মাত্র।দেনমোহর স্বামীর ঋণ, যা স্বামী তাঁর স্ত্রীকে পরিশোধ করতে বাধ্য। মাহমুদা খাতুন বনাম আবু সাইদ (21 DLR) মামলায় মহামান্য বিচারপতি কর্তৃক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে, ‘সহবাসের আগে এবং পরে স্ত্রী স্বামীর কাছে তলবী মোহরানার দাবি করতে পারে এবং স্বামী তলবী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী তার স্বামীর অধিকারে অর্থাৎ সহবাসে যেতে স্ত্রী অস্বীকার করতে পারেন।’ এ অজুহাতে স্বামী স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করলে তা পরিশোধে বাধ্য। (11 DLR WP) লাহোর 124। স্বামী এহেন মোহরানা পরিশোধ ব্যতীত দাম্পত্য অধিকারের ডিক্রি পেতে পারে না। যে কোন বিষয় সম্পত্তি মোহরানার জন্য ধার্য করা যায় না। ইহা হতে পারে নগদ অর্থ, কোন বীমা পলিসি বা অন্য কোন দ্রব্য সামগ্রী। তবে কোন হারাম বস্তু হতে পারবে না। স্বামীর দখলে নেই এমন কোন সম্পত্তি পারে না। ভবিষ্যত কোন বিষয়ও এর অন্তর্ভূক্ত হতে পারবে না।দেনমোহর নির্ধারণ পদ্ধতি
মোহরানার পরিমান সুনির্দিষ্টভাবে বেঁধে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ বর ও কণের উভয়ের দিক বিবেচনান্তে তা নির্ধারিত হয়। দেনমোহর কত হবে তা নির্ণয়কালে স্ত্রীর পিতার পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যদের ক্ষেত্রে যেমন- স্ত্রীর বোন, খালা, ফুফুদের ক্ষেত্রে দেনমোহরের পরিমাণ কত ছিল তা বিবেচনা করা হয়। তাছাড়া স্ত্রীর পিতার আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। অপর দিকে বরের আর্থিক ক্ষমতার দিকটাও বিবেচনায় রাখা হয়। এসব দিক বিচার বিবেচনা করেই মূলতঃ দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়

১৯৬১ সালের পারিবারিক আইনের ১০ ধারা মোতাবেক, দেনমোহর পদ্ধতি সম্পর্কে কাবিনে বিস্তারিত উল্লেখ না থাকিলে স্ত্রীর তলব মাত্র সম্পর্ণ টাকা পরিশোধ করিতে হইবে। স্ত্রীকে তালাক দিবার ব্যাপারে স্বামীকে প্রতিশ্র“ত যাবতীয় অর্থ প্রদান করিতে হইবে এবং প্রতিশ্র“ত অর্থের পরিমাণ অনেক বেশী কিংবা স্বামীর পরিশোধ ক্ষমতার বাহিরে, এই যুক্তিই স্ত্রী দাবীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব নহে। কিন্তু [বেইলী-২য়, ৬৭) অনুযায়ী শিয়া আইনে দেনমোহরের সর্বনিম্ন কোন অর্থ নির্দিষ্ট নাই।

“ন্যায্য” দেন মোহর (মোহর-ই-মিছিল):
দেনমোহরের পরিমাণ যদি নির্দিষ্ট করা না হইয়া থাকে, স্ত্রী দেনমোহর নির্ণয় কালে স্ত্রীর পিতার পরিবারের অন্যান্য মহিলা। সদস্যর ক্ষেত্রে যেমন, তাহার পিতার ভগ্নিনীর ক্ষেত্রে, দেনমোহরের পরিমান কত ছিল তাহা বিবেচনা করিতে হইবে। [হেদায়া,৪৫
বেঈলী-৯২]

দেনমোহর নিশ্চিত হয় দাম্পত্য মিলন দ্বারা, বৈধ অবসর, স্বামী অথবা স্ত্রীর মৃত্য দ্বারা, কিন্তু শিয়া আইনে কিছুটা ব্যাতিক্রম রয়েছে, দাম্পত্য মিলন , অথবা পক্ষদ্বয় যে কোন একজনের মৃত্যর মৃত্যর ফলে দেনমোহরের অধিকার প্রতিষ্টিত হয়। একটি বিষয় না বললেই না স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক দিলে দেনমোহরের পরিমাণ অর্ধেক হইবে। কিন্তু দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্বামীর মৃত্যু হইলে স্ত্রীকে সম্পূর্ণ দেনমোহরে প্রদান করিতে হইবে।

দেনমোহরের বাবদ দেয় অর্থকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

তাৎক্ষনিক” যাহা চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য এবং অপরটি

বিলম্বিত” দেনমোহর-যাহা মৃত্য অথবা তালাকের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ পরিশোধযোগ্য।

দেনমোহরের মামলা ও তামাদী আইনঃ-
স্ত্রী, তাহার, দেনমোহরের টাকা না পাইলে, সে এবং তাহার মৃত্যর পর তাহার উত্তরাধিকারীগণ, উহার জন্য মামলা দায়ের করিতে পারে তাৎক্ষনিক দেনমোহর আদায়ের মামলা দায়ের করিবার সময় সীমা হইল দেনমোহরটি দাবী ও উহা প্রদানে অস্বীকৃতির তারিখ হইতে তিন বছর, অথবা যেখানে বিবাহ থাকাকালীন এই জাতীর কোন দাবীই উস্থাপিত হয় নাই, সেখানে মৃত্য কিংবা তালাকের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিলে, তখন পর্যন্ত ১৯০৮ সালের তামাদী আইন, তফসীল-১, অনুচ্ছেদ-১০৩ “বিলম্বিত” দেন মোহরটি আদায়ের সময় সীমা হইল মৃত্য অথবা তালাকের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিলে ঐ তারিখ হইতে তিন বৎসর [তফসীল-১, অনুচ্ছেদ-১০৪] “বিলম্বিত” দেনমোহরের দাবীতে স্বামীর সম্পত্তি বিধবার বৈধ দখলে থাকাকালীন তামাদীর মেয়াদ বিধবার বিপক্ষে যাইতে না, স্ত্রী লিখিতভাবে তালাক প্রাপত হইলে, তামাদী আইনের ১০৩ ও ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্ত্রীকে উক্ত লিখিত তালাক দানের তথ্য বা সংবাদটি অবগত করিবার তারিখ হইতেই তামাদীর সময় শুরু হইবে আদায়ের দাবীতে মামলা দায়ের করিবার অধিকার স্ত্রী রহিয়াছে।

অপরিশোধিত দেনমোহর একটি ঋণ এবং নীতিটি হইল এই যে, অধমর্ণ উত্তমর্নকে অনুসন্ধান করিবে। অতএব, স্ত্রী থাকিলে ও স্বামীর ঠিকানা জানানো থাকিলে স্ত্রী বাসস্থানটি যে আদালতের আত্ততাভূক্ত, স্ত্রী সেখানেই মামলাটি দায়ের করিতে পারিবে, বিখ্যাত মামলা তুলনা দিতে পারি এই ক্ষেত্রে শাহ বানু বেগম বনাম ইফতেখার মাহমুদ খান (1957) 2 WP 748, (56) P, kar, 363 এবং
22 DLR-677 মামলায় বলা হয়েছে, দেনমোহর কখনই মাফ হয় না। স্বামী যদি মারাও যায় তবে সে স্বামীর সম্পদ হতে দেনমোহর আদায় করা যায়। অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পর যদি স্ত্রী সমুদয় অথবা শুধুমাত্র বিলম্বিত দেনমোহরের অর্থ অনাদায়ী থেকে থাকে।  তবে স্ত্রী তার প্রয়াত স্বামীর ভূ-সম্পত্তি দখল করত উহার রাজস্ব বা মুনাফা হতে তা উসুল করতে পারে। কেননা ইসলামী আইনে দেনমোহরকে দেনা বলে বিবেচনা করা হয়। দেনমোহরের পরিমাণ যত বেশি হোক না কেন, পক্ষগুলোর মধ্যে স্বীকৃত হলে স্বামী তা সম্পূর্ণ রূপে স্ত্রীকে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে। এমনকি স্বামীর আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও আদালত দেনমোহরানার দায় হতে স্বামীকে মুক্তি দেবে না।

আরেকটি কেস ষ্টাডিতে দেখা যায়, রুমী নামের একটি মেয়ের বিয়ের দুই দিনের মাথায় স্বামীর সাথে তালাক হয়ে যায়। দেনমোহরের মামলায় কাবিননামায় যে পরিমাণ অর্থ উল্লেখ ছিল সে পরিমাণ অর্থ স্ত্রী দাবি করে ওই স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে। ওই মামলায় স্বামী অর্থাৎ মামলায় যিনি বিবাদীপক্ষ তিনি দাবি তোলেন যে, কাবিননামায় উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ ঠিক নয়। বিবাদী পক্ষ উক্ত মামলার জবাবে দম্পতির সহবাস সংগঠনের আগে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবী করে সাকুল্য মোহরানার অর্ধেক পরিশোধ করতে রাজী হয়। এক্ষেত্রে যদি স্বামী সমুদয় অংশ প্রদান করেন তবে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সহবাস যদি  হয়ে থাকে, তবে স্বামী সমুদয় মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য। তবে বলে রাখা উচিত সহবাস হয়েছিল কিনা তা প্রমাণের সম্পূর্ণ দায় বাদীপক্ষের অর্থাৎ স্ত্রীর। অর্থাৎ স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলে স্ত্রী অর্ধেক মোহরানা পাবে। যদি স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বেই মারা যায় তাহলে স্ত্রী সম্পূর্ণ মোহরানা পাবে।

জামিনদারঃ
যদি কোন ব্যক্তি একজনের স্বামীর স্ত্রীর মোহরানার দায়িত্ব নেয় তবে সে উহা পরিশোধের জন্য দায়ী হবে। বিবাহ উত্তর দেনমোহরের জন্য জামিনদার থাকলে সেক্ষেত্রেও জামিনদার দায়ী হবে। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।

উত্তরাধিকারীগণ দেনমোহর ঋণের দায়ঃ-
মৃত মুসলমানের উত্তরাধিকারীগণ দেনমোহর ঋণের জন্য ব্যক্তি গতভাবে দায়ী নহে। মুসলিম আইনে ৪৩ ধারা অনুযায়ী মৃত্যের নিকট প্রাপ্য অনগদ ঋণের ন্যায়-দেনমোহর ঋণের উত্তরাধিকারীর মৃত্যের সম্পত্তিতে প্রাপ্য অংশের আনুপাতিক হারে প্রত্যেক উত্তরাধিকারী দায়ী হইবে।
সুতরাং বিধবা স্ত্রী দেনমোহরের দাবীকে তাহার স্বামীর সম্পত্তির দখলে থাকিলে তাহার স্বামীর অন্যান্য উত্তরাধিকারীগণ সম্পত্তিতে নিজ নিজ প্রাপ্য অংশের আনুপাতিক হারে দেনমোহর ঋণ পরিশোধ করিবার পর পৃথক ভাবে স্ব স্ব অংশ উদ্ধার করিতে পারিবে। যদি স্বামীর উত্তরাধিকারীরা স্বামীর সম্পত্তি থেকে দেনমোহর দিতে অস্বীকার করেন তাহলে স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারবেন। উল্লেখ্য, যদি স্বামীর আগে স্ত্রীর মৃত্যু হয় এবং স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধিত না হয়ে থাকে তাহলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা ঐ দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী। ফলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা দেনমোহর পাওয়ার জন্য আদালতে  মামলা করতে পারবেন।

বিধবার দেনমোহরের পরিবর্তে স্বামীর ভূসম্পত্তি স্বীয় দখলে রাখিবার অধিকারঃ
মুসলিম আইনে ধারা ২৯৬ এই বিষয়টি পর্যালোচনা হয়েছে। বিধবার দেনমোহরের দাবী তাহাকে তাহার স্বামীর কোন সুনির্দিষ্ট সম্পত্তিতে কোন “চার্জ” সৃষ্টির অধিকারী করেনা। কিন্তু যখন তাহার “দেনমোহরের পরিবর্তে” সে প্রতারণা ব্যাতিরেকে এবং “বৈধভাবে” তাহার মৃত স্বামীর সম্পত্তি লাভ করিয়া এবং উহার দখলে থাকিবে, সে তাহার দেনমোহর পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তাহার স্বামীর সম্পত্তি নিজ দখলে রাখিতে পারিবে। অর্থাৎ এই যুক্তিতে বলা যায় যখন সে দখলে থাকিবে সম্পত্তিতে আয় হইতে যে দেনমোহরের পাওনা আদায় করিবে।  বিধবা তাহার প্রাপ্য দেনমোহরের পরিবর্তে তাহার মৃত স্বামীর ভূ-সম্পত্তি নিজ দখলে আনে নাই, যে তাহার স্বামীর অন্যান্য উত্তরাধিকারীগণকে উহার দখল লাভে বাধঅ দিতে পারে না।
মুসলিম আইনে ৩০৩ ধারায় বিধবা দেনমোহরের দাবীতে স্বামীর সম্পত্তিতে দখলভোগী থাকা কালীন অন্যায়ভাবে উহা বেদখল হইলে দখল উদ্ধারের জন্য মামলা অবশ্যই ছয় মাসের মধ্যে দায়ের করিতে হইবে [১৯০৮ সালের তামাদি আইন, তফসিল-১ অনুচ্ছেদ-৩]ব অনুযায়ী।

লেখক :
সোয়েব রহমান
এলএল.এম.
অ্যাডভোকেট

Shoaibur Rahman Shoaib
LL.M Advocate

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: